রহইন পরব ও তার লোকতান্ত্রিক দর্শন
কুড়মি সমাজের ‘রহইন পরব’ মূলত কৃষিজীবন, উর্বরতা, প্রকৃতি ও লোকবিশ্বাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি আদি লোকউৎসব। এই পরবের মধ্যে ধর্মীয় আচার যেমন আছে, তেমনি রয়েছে লোকতান্ত্রিক ও তান্ত্রিক বিশ্বাসের নানা স্তর। তবে এখানে “তন্ত্র” বলতে মূলধারার শৈব-শাক্ত তন্ত্রশাস্ত্রের জটিল সাধনা নয়; বরং গ্রামীণ লোকতন্ত্র, প্রকৃতি-পূজা, মন্ত্রবিশ্বাস, ফসলরক্ষা ও অশুভ শক্তি প্রতিরোধের আচারকে বোঝায়। য্যামোন প্রত্যেক শুভ কাজের সূচনাতেই লাগে একমুঠো পবিত্র রহইন মাটি। কুড়মি সমাজের বিশ্বাস, এই মাটি শুধু মাটি নয়—এ এক আশীর্বাদ, এক শুভশক্তির প্রতীক। পুরনোদের মুখে মুখে ভেসে আসা শ্রুতিতে জানা যায়, একসময় রহইন মাটি আনতে যাওয়া হত সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায়। কালের প্রবাহে সেই রীতি বদলেছে বটে, কিন্তু এখনও বহু স্থানে একটি মাত্র বস্ত্র পরে, মাছি আঁধরার ক্ষণে, বিশেষ নিয়ম মেনে এই মাটি সংগ্রহ করা হয়।
এই নেগের মধ্যে তান্ত্রিক সাধনা ও গুপ্ত আচারের সঙ্গে এক গভীর সাযুজ্য খুঁজে পাওয়া যায়। মাটি আনার সময় পালন করতে হয় পূর্ণ মৌনতা; কোনো কথা নয়, কোনো অকারণ শব্দ নয়। যেন নীরবতার মধ্য দিয়েই সম্পন্ন হয় এক পবিত্র সাধনা। কুড়মি সমাজে এমন বহু নেগ-নেগাচার রয়েছে, যা লোকচক্ষুর আড়ালে, নিঃশব্দে এবং নির্জনতায় সমাধা করা হয়। বিশ্বাস করা হয়, প্রকাশের চেয়ে গোপনীয়তাই তাদের শক্তিকে অটুট রাখে।
ছবি: প্রতিকী
রহইন মাটির ব্যবহারও বহুমুখী। টটকা, বিভিন্ন পরব-পার্বণের নেগাচার, চুমান-র অনুষ্ঠান—সবখানেই এর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এমনকি লোকঔষধির অ্যান্টিসেপটিক হিসেবেও এর কদর ছিল উচ্চস্থানে এবং এখনও অনেকাংশে আছে। ছাগল বা খাসি খোজা করার পর কাটা স্থানে প্রথমেই দেওয়া হত রহইন মাটি; একান্ত অভাবে ব্যবহার করা হত ছৈঁচ মাটি। পুরখাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেই প্রাচীন কালের উলঙ্গ অবস্থায় সংগৃহীত রহইন মাটির কার্যকারিতা নাকি ছিল আরও বেশি। তখন মাটি সংগ্রহের সময় কোনো আধুনিক বা ধাতুনির্মিত যন্ত্রের ব্যবহার ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আরও কিছু অলিখিত বিধি-নিষেধ, যা আজ আর খুব কম মানুষেরই জানা।
আধুনিকতার আবরণে সমাজের বহু -বিটি-ব্যবহার যেমন বদলে গেছে, তেমনি রহইন মাটিও যেন হারিয়েছে তার কিছু প্রাচীন মর্যাদা, ঐতিহ্য ও গুণাগুণের স্বীকৃতি। তবু আজও এই মুঠোভর্তি মাটির মধ্যে লুকিয়ে আছে কুড়মি সমাজের বহু শতাব্দীর লোকবিশ্বাস, আচার, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। রহইন মাটি তাই কেবল মাটি নয়—এ এক জীবন্ত ঐতিহ্য, যা অতীত ও বর্তমানের মধ্যে নীরব সেতুবন্ধন। তাই রহইন পরবের তান্ত্রিক বা লোকতান্ত্রিকতার সাযুজ্য প্রচুর। সে সমস্ত আলোচ্য দিকগুলি অনেকটা নিম্নরূপ:--
★ উর্বরতা ও শস্যরক্ষার আচার
রহইন পরব সাধারণত কৃষিকাজের গুরুত্বপূর্ণ সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই সময় জমি, বীজ ও ফসলকে “জাগ্রত” করার জন্য নানা প্রতীকী আচার করা হয়।
অনেক জায়গায় দেখা যায়—
ধানবীজ বা চারা বিশেষ মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে আশীর্বাদ করা হয়।
জমির চার কোণে হলুদ, সিঁদুর, ধূপ বা ডিম দেওয়া হয় অশুভ শক্তি দূর করতে।
কখনও মুরগি বা পায়রা বলির লোকাচারও ছিল, যদিও এখন অনেক জায়গায় তা কমে গেছে।
এগুলি মূলত কৃষিতান্ত্রিক বিশ্বাসের অংশ।
★ ‘অশুভ শক্তি’ প্রতিরোধ:
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী রোগ, পোকামাকড়, খরা বা দুর্ভিক্ষকে অনেক সময় অদৃশ্য অশুভ শক্তির প্রভাব বলে ভাবা হত। তাই—
ওঝা বা গুণিন মন্ত্রপাঠ করতেন,
আগুন, ধোঁয়া বা নির্দিষ্ট গাছের ডাল ব্যবহার করা হত,
গ্রামের সীমানায় প্রতীকী বাঁধন বা “রক্ষা রেখা” তৈরি করা হত।
এগুলি একধরনের লোকতান্ত্রিক প্রতিরক্ষা আচার।
★ নারীশক্তি ও ধরিত্রী পূজা:
রহইন পরবে ধরিত্রী বা মাটিকে মাতৃরূপে কল্পনা করা হয়। শাক্ত তন্ত্রের সঙ্গে এর একটি সাংস্কৃতিক সাদৃশ্য পাওয়া যায়।
কিছু অঞ্চলে—
ধান, জল, মাটি ও নারীত্বকে একই উর্বরতার শক্তি হিসেবে দেখা হয়।
বিবাহিতা নারীরা বিশেষ ব্রত পালন করেন।
মাটি না খোঁড়া বা নির্দিষ্ট দিন কৃষিকাজ বন্ধ রাখার নিয়ম থাকে, যেন “ধরিত্রী বিশ্রাম পান”।
★ মন্ত্র ও গোপন লোকবিশ্বাস:
অনেক কুড়মি গ্রামে এখনও কিছু আচার কেবল গ্রামের প্রবীণ বা গুণিনেরা জানেন। এগুলি লিখিত নয়, মৌখিকভাবে চলে এসেছে।
যেমন—
ফসলরক্ষার মন্ত্র,
সাপ বা রোগ দূর করার মন্ত্র,
বৃষ্টির আহ্বানমূলক গান বা ছড়া।
এসবের মধ্যে লোকতন্ত্র, অ্যানিমিজম (প্রাণবাদ) ও আদিবাসী ধর্মবিশ্বাসের মিশ্রণ দেখা যায়।
ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট
কুড়মি সমাজের পরব-পার্বণে আর্য, দ্রাবিড়, অস্ট্রিক ও স্থানীয় আদিবাসী সংস্কৃতির মিশ্র প্রভাব রয়েছে। রহইন পরবও সম্ভবত সেই প্রাচীন কৃষিভিত্তিক সংস্কৃতির ধারক। পরে শাক্ত ও লোকহিন্দু ধর্মের কিছু উপাদান এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। তাই রহইন পরবের তান্ত্রিকতা মূলত—
প্রকৃতিনির্ভর,
কৃষিকেন্দ্রিক,
লোকবিশ্বাসভিত্তিক,
এবং সামাজিক ঐক্যের প্রতীক।
এটি কোনও “কালোজাদু” বা ভয়াবহ গূঢ়তন্ত্র নয়; বরং মানুষের জীবন, ফসল ও প্রকৃতিকে রক্ষার প্রাচীন লোকজ আধ্যাত্মিকতা।
কুড়মি সমাজের “রহইন পরব” মূলত কৃষি, উর্বরতা, ভূমি-শক্তি ও সামষ্টিক সুরক্ষার সঙ্গে যুক্ত একটি লোক-আচার। এর ভিত আদিবাসী-লোকবিশ্বাসে হলেও পশ্চিমাঞ্চলীয় বাংলার বহু লোকাচারের মতো এর মধ্যেও পরবর্তীকালে শৈব, শাক্ত, বৈষ্ণব এবং বৌদ্ধ তান্ত্রিক প্রভাব মিশে যায়। বিশেষ করে পাল যুগে বাংলায় ও জঙ্গলমহলে Vajrayana Buddhism বা বজ্রযান বৌদ্ধধর্মের বিস্তারের ফলে বহু তান্ত্রিক প্রতীক ও আচার লোকধর্মে ঢুকে পড়ে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা—রহইন পরব সরাসরি “বজ্রযান বৌদ্ধ উৎসব” নয়। বরং লোকসংস্কৃতির মধ্যে বজ্রযানী তন্ত্রের কিছু উপাদান মিশে গেছে বলে অনেক লোকগবেষক মনে করেন। এ বিষয়ে একমত ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেই; এটি মূলত তুলনামূলক লোকসংস্কৃতি বিশ্লেষণের বিষয়।
রহইন পরবে বজ্রযানী/তান্ত্রিক প্রভাব যেভাবে দেখা যায় বলে গবেষকেরা ব্যাখ্যা করেন—
১. ভূমি ও শক্তিপূজার ধারণা
বজ্রযানে নারীশক্তি, ভূমি, উর্বরতা ও “শক্তি”-কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। রহইন পরবেও—
জমি,
ধান,
বীজ,
মাটি,
গ্রামরক্ষাকারী শক্তি
—এসবকে কেন্দ্র করে আচার হয়।
এখানে “মাটি জীবন্ত শক্তি” — এই ধারণা তান্ত্রিক ভাবনার সঙ্গে মিলে যায়।
২. গোপন বা সীমাবদ্ধ আচার
বজ্রযানের বহু আচার ছিল গুপ্ত বা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকেন্দ্রিক। রহইন পরবের কিছু “নেগ” বা লোকাচারও শুধুমাত্র নির্দিষ্ট পরিবার, পুরোহিত, পাহান বা প্রবীণদের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
যেমন—
নির্দিষ্ট মন্ত্র,
রাতের আচার,
নিষিদ্ধতা,
বাইরের লোকের প্রবেশে বাধা
—এসব তান্ত্রিক আচারধারার স্মৃতি বহন করতে পারে।
৩. রক্ত, বলি ও প্রতীকী উৎসর্গ
বজ্রযানের কিছু শাখায় পঞ্চমকার, বলি, রক্ত বা শক্তির প্রতীকী ব্যবহার ছিল। রহইন পরবেও কোথাও কোথাও—
মুরগি বলি,
ডিম উৎসর্গ,
হাড়িয়া নিবেদন,
লাল সিঁদুর বা রক্তরঙের ব্যবহার
দেখা যায়। এগুলো শাক্ত-তান্ত্রিক ও প্রাচীন লোকতান্ত্রিক আচার উভয়ের সঙ্গেই সম্পর্কিত।
৪. মণ্ডল বা বৃত্তাকার আচার
বজ্রযানে মণ্ডল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রহইনের কিছু নেগে—
উঠোনে চিহ্ন আঁকা,
ধান/আটা দিয়ে বৃত্ত তৈরি,
কেন্দ্রস্থ প্রতীক রাখা,
চারদিক রক্ষা করা
—এসবকে লোকায়ত মণ্ডল-চেতনার সঙ্গে তুলনা করা হয়।
কোন কোন “নেগ”-এ এই তান্ত্রিকতা বেশি দেখা যায়।
অঞ্চলভেদে নেগের নাম বদলায়। তবে সাধারণভাবে নিচের আচারগুলিতে তান্ত্রিক বা বজ্রযানী প্রভাবের ইঙ্গিত বেশি দেখা যায় বলে ধরা হয়—
১. মাটি বাঁধা / ক্ষেত বাঁধা নেগ
ক্ষেত বা গ্রামকে “অশুভ” থেকে রক্ষা করার জন্য সুতো, ডাল, রক্ত, ধান বা মন্ত্র ব্যবহারের প্রথা।
এটি তান্ত্রিক “রক্ষাচক্র” ধারণার সঙ্গে তুলনা করা হয়।
২. বীজ জাগানো নেগ
ধান বা বীজকে জীবন্ত শক্তি ধরে তাকে জাগানো, আশীর্বাদ দেওয়া, নির্দিষ্ট দিনে স্পর্শ করা—এতে উর্বরতা-তন্ত্রের ছাপ দেখা যায়।
৩. নিশি-পূজা বা রাতের নেগ
যে আচার গভীর রাতে হয় এবং সীমিত মানুষ অংশ নেয়, সেখানে তান্ত্রিকতার প্রভাব বেশি বলে মনে করা হয়।
৪. বলি বা রক্তনিবেদন নেগ
বিশেষত গ্রামদেবতা বা ভূমিদেবীর উদ্দেশ্যে বলি দেওয়ার রীতি শাক্ত-বজ্রযানী মিলনের উদাহরণ হিসেবে ধরা হয়।
৫. হাড়িয়া নিবেদন
মদ্য বা গাঁজনজাত দ্রব্য উৎসর্গ বজ্রযানের কিছু আচারেও ছিল। রহইন পরবের কিছু অঞ্চলে হাড়িয়া নিবেদন সেই লোকতান্ত্রিক ধারার সঙ্গে যুক্ত।
৬. মন্ত্রপাঠ ও গুপ্ত সংকেত
কিছু নেগে এমন মন্ত্র বা শব্দ ব্যবহার হয় যার অর্থ সাধারণ মানুষ জানে না। এগুলিকে লোকায়ত তান্ত্রিক মন্ত্রের অবশেষ বলে ধরা হয়।
ঐতিহাসিকভাবে জঙ্গলমহল, মানভূম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর অঞ্চলে পাল যুগের বৌদ্ধ তন্ত্র, পরবর্তী শাক্ত তন্ত্র এবং আদিবাসী ভূমি-উপাসনা একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়।
জৈন দর্শন ও রহইন পরবের তান্ত্রিকতা
জৈন ধর্মমত ভিন্ন হলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে সহাবস্থানের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। যদিও জৈন ধর্ম অহিংসা ও সংযমকেন্দ্রিক; কিন্তু মধ্যযুগে বিশেষত পূর্বভারতে কিছু জৈন যক্ষ-যক্ষিণী উপাসনা, মন্ত্র, রক্ষাচক্র, লোকদেবতা পূজা ইত্যাদির মাধ্যমে এক ধরনের লোকতান্ত্রিক বা গুপ্ত আচার গড়ে ওঠে। এই লোকজ স্তর থেকেই কিছু উপাদান রহইন পরবের সঙ্গে মিশেছে বলে ধারণা করা হয়।
১. বীজরক্ষা নেগ
ধান বা বীজকে “জীবন্ত” মনে করে সংরক্ষণ করা।
জৈন জীববাদ (সব জীবের প্রাণ আছে) এর সঙ্গে এর ভাবগত মিল দেখা হয়।
২. উপবাস বা ব্রতধর্মী নেগ
পরবের আগে নির্দিষ্ট খাদ্যবিধি মানা, শুদ্ধ থাকা—এতে জৈন ব্রতসংস্কৃতির সাদৃশ্য রয়েছে।
৩. অহিংস নিবেদন নেগ
যেসব অঞ্চলে প্রাণী বলির বদলে—
ফল,
শস্য,
দুধ,
হাড়িয়া
দেওয়া হয়, সেগুলিকে জৈন প্রভাবিত লোকরূপ বলে ব্যাখ্যা করা হয়।
৪. ক্ষেতরক্ষা নেগ
ক্ষেতের চারদিকে প্রতীক আঁকা বা পবিত্র সুতো বাঁধা—এটি জৈন ও লোকতান্ত্রিক উভয় ধারাতেই দেখা যায়। তাছাড়াও রক্ষাচিহ্ন ও মঙ্গলচিহ্ন
জৈন লোকাচারে স্বস্তিক, অষ্টমঙ্গল, বৃত্তাকার প্রতীক ইত্যাদি ব্যবহৃত হত। রহইনের নেগে—
উঠোনে চউকপুরার চিহ্ন আঁকা,
ধানের আলপনা,
চারকোণা বা বৃত্তাকার রক্ষাবন্ধন
—এসবের মধ্যে সাদৃশ্য দেখা যায়।
কোন কোন নেগে জৈন লোকধর্মের ছাপ বেশি দেখা যায়?
৫. পবিত্র দিক নির্ধারণ
আচার করার সময় পূর্বদিক বা নির্দিষ্ট দিক মানা—জৈন মন্দির ও লোকআচারের মধ্যেও এর মিল পাওয়া যায়।
ঐতিহাসিক পটভূমিঃ
পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়খণ্ড অঞ্চলে একসময় জৈন ধর্মের ব্যাপক প্রভাব ছিল। আজও বহু প্রাচীন জৈন মূর্তি ও স্থাপত্য পাওয়া যায়, যেমন—
পাকবিড়রা জৈন মন্দির
দেউলঘাটা
তেলকুপি প্রত্নক্ষেত্র
এই অঞ্চলেই পরে কুড়মি, ভূমিজ, সাঁওতালসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর লোকাচারের সঙ্গে জৈন ও বৌদ্ধ উপাদান মিশে যায়।
তবে মনে রাখতে হবে—
রহইন পরবকে “জৈন উৎসব” বলা যায় না। বরং এটি বহুস্তরীয় লোকসংস্কৃতি, যেখানে প্রাচীন কৃষি-সংস্কার, আদিবাসী ভূমি-পূজা, জৈন লোকধর্ম, বৌদ্ধ তন্ত্র ও শাক্ত উপাদান একত্রে মিশেছে।
রহইন পরব ও কুড়মি সমাজের লোকতান্ত্রিক/তান্ত্রিক বিশ্বাস নিয়ে যে ধারণা পাওয়া যায় তা মূলত লোকসংস্কৃতি, নৃতত্ত্ব ও জঙ্গলমহলের কুড়মি সমাজের প্রচলিত আচার-অনুশীলনের সমন্বিত বিশ্লেষণ। এই বিষয়ে নির্দিষ্ট একক বই বা গবেষণাপত্র খুবই কম তবে নিচের উৎসগুলি থেকে বিষয়টির ওপর ভিত্তি করে খুব ইঙ্গিতবাহী সূত্র কিঞ্চিৎ পাওয়া যায়।
★বই ও গবেষণা-উৎস★
পশ্চিমবঙ্গের লোকসংস্কৃতি — ড. আশুতোষ ভট্টাচার্য
বাংলার লোকধর্ম ও উৎসব পরিচয় — প্রদ্যোত কুমার মাইতি
জঙ্গলমহলের লোকসংস্কৃতি — বিভিন্ন গবেষণা সংকলন
কুড়মালি লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক প্রবন্ধসমূহ
নৃতত্ত্ববিদদের আদিবাসী কৃষি-আচার ও লোকবিশ্বাস সংক্রান্ত গবেষণা
যে বিষয়গুলির উপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছিলঃ
কৃষিভিত্তিক উৎসবে উর্বরতা আচার
ধরিত্রী বা মাটির মাতৃরূপ ধারণা
ওঝা/গুণিনের মন্ত্রচর্চা
অশুভ শক্তি প্রতিরোধের লোকাচার
শস্যরক্ষা ও বর্ষা আহ্বানের আচার
এই ধরনের উপাদান ভারতীয় লোকধর্ম ও আদিবাসী সংস্কৃতি গবেষণায় বহুল আলোচিত। ভারতীয় লোকশ্রুতি ও লোকবিশ্বাস বিষয়ে সাধারণ প্রেক্ষাপট পাওয়া যায়। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—
“রহইন পরবের তান্ত্রিকতা” নিয়ে একাডেমিকভাবে খুব বিস্তারিত লিখিত নথি এখনও সীমিত। অনেক তথ্য মৌখিক ঐতিহ্য, প্রবীণদের বয়ান ও স্থানীয় চর্চার উপর নির্ভরশীল। তাই অঞ্চলভেদে আচারেও পার্থক্য দেখা যায়।








